ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ট্রাম্পের

ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় বৈশ্বিক পুঁজিবাজার, নিম্নমুখিতা ডলারের বিনিময় হারে

ইরান-ইসরায়েলের সংঘাতে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় জটিল ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছিল, যা নেতিবাচক প্রবণতায় ভুগতে থাকা বৈশ্বিক পুঁজিবাজার, মুদ্রাবাজার ও পণ্যবাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

ইরান-ইসরায়েলের সংঘাতে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় জটিল ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছিল, যা নেতিবাচক প্রবণতায় ভুগতে থাকা বৈশ্বিক পুঁজিবাজার, মুদ্রাবাজার ও পণ্যবাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে। তবে গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সে উত্তেজনার অনেকটাই প্রশমন ঘটেছে, যার দ্রুত প্রভাব পড়েছে বাজারগুলোয়। বিশেষ করে গতকাল দিনের শুরুতে এশিয়ার

পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যায়, অন্যদিকে ডলারের বিনিময় হারে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির নাটকীয় মোড়ের ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ৪ শতাংশ।

কানাডাভিত্তিক টিডি সিকিউরিটিজের সিনিয়র এশিয়া-প্যাসিফিক রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত নিউনাহা বলেন, ‘মনে হচ্ছে বাজারে উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে। অন্যদিকে স্থগিত হওয়া মার্কিন শুল্ক আরোপের সময়সীমা দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হচ্ছে। তাই নজর এখন সেদিকে চলে যাবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত মিটে যাওয়ায় বাজারে আশা তৈরি হয়েছে যে বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত আলোচনাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে যাবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রতি আগ্রহ হঠাৎ বেড়ে যায়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর মার্কিন এসঅ্যান্ডপি ফিউচারস সূচক ১ শতাংশ এবং নাসডাক ফিউচারস ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ে। ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক বাড়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে এয়ারলাইনসসহ ভ্রমণসংশ্লিষ্ট শেয়ারদর ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানির শেয়ারদরে ৩ শতাংশ পতন ঘটে।

গতকাল লেনদেনের শুরুতেই এশিয়ার বাজারে চাঙ্গা ভাব দেখা যায়। এমএসসিআইয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক সূচক (জাপান ছাড়া) ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যায়। জাপানের নিক্কেই সূচক বাড়ে ১ দশমিক ১ শতাংশের বেশি। বিশেষ করে চীনের বাজারে রেকর্ড ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সাংহাই কম্পোজিট সূচক দুপুরের ট্রেড বিরতির সময় ১ শতাংশ বেড়ে যায়, যা গত ২০ মার্চের পর সর্বোচ্চ পর্যায়। ব্লু-চিপ শেয়ারভিত্তিক সিএসআই ৩০০ সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে ওঠে।

এছাড়া হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ দৈনিক বৃদ্ধি হিসেবে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে রেকর্ড। এ বাজারে শেয়ারদর বৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল প্রযুক্তি ও গাড়ি খাতের কোম্পানিগুলো। হ্যাং সেং অটোমোবাইল সূচক ৩ শতাংশ এবং হ্যাং সেং টেক সূচক বাড়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

চীনের পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা প্রসঙ্গে ব্যাংক অব চায়না (ইন্টারন্যাশনাল) সিকিউরিটিজের বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতা বর্তমানে তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর মানে হলো পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার জেরে যদি শেয়ারবাজারে আবার পতন আসে, তা নতুন করে শেয়ার কেনার সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তবে বন্ডের বাজারে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনার বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। কারণ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড গতকাল ট্রাম্পের ঘোষণার পর ৫ বেসিস পয়েন্ট কমে ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমেছে এবং সেখানেই স্থিতিশীল ছিল।

যুদ্ধবিরতির প্রভাবে মুদ্রাবাজারে প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দ্রুত কমতে দেখা গেছে। ডলার দশমিক ৭ শতাংশ দুর্বল হয়ে বিনিময় হার দাঁড়ায় ১৪৫ দশমিক ৪৩ ইয়েনে, যা আগের রাতে ছিল ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চ ১৪৮ ইয়েন। ইউরো দশমিক ২ শতাংশ শক্তিশালী হয়ে বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১ ডলার ১৬ সেন্টে। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দামের পতনে ইউরো ও ইয়েন সুবিধা পেয়েছে। কারণ ইউরোপ ও জাপান উভয়ই জ্বালানি তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসে আমদানিনির্ভর দেশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র রফতানিকারক।

ঝুঁকিপূর্ণ মুদ্রা হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ান ও নিউজিল্যান্ড ডলার এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গতকাল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ডলারের বিনিময় হারের বিপরীতে এ দুই মুদ্রা যথাক্রমে দশমিক ৫ শতাংশ ও দশমিক ৫৫ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের সিনিয়র মুদ্রানীতি বিশ্লেষক রদ্রিগো ক্যাট্রিল বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের জন্য এটি অবশ্যই ইতিবাচক খবর। তবে যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি কী এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ নিতে পারে কিনা সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা এখনো বাকি।’

আরও